তন্বি ও পাখি
বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে তন্বি। অপূর্ব সুন্দর আকাশ, ছোট তারা ও এক ফালি চাঁদ। হালকা বাতাসে ফুলগুলো উড়ছে। তন্বির মনটা আজ একটু খারাপ, কারণ তার পুরনো বন্ধু আজ চলে গেল।
দুই মাস আগের কথা— তন্বি তার পরিবারের সাথে নতুন এক জায়গায় থাকতে এল। জায়গাটা তন্বির খুব পছন্দ হলো। বাবা তাকে এখানেই একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দিলেন।কিন্তু সে তার পুরনো বন্ধুদের খুব মিস করছিল। নতুন স্কুলে তার বন্ধু তেমন হয়ে ওঠেনি, তাই তন্বির দিনগুলো একাকী কাটছিল
একদিন তন্বি ও তার মা বারান্দায় বসে গল্প করছিল। হঠাৎ তন্বি লক্ষ্য করল, একটি দোয়েল পাখি বারান্দার কোণে একটি ছোট টিনের কৌটার ভেতর খড়কুটো দিয়ে বাসা তৈরি করছে। তন্বি অবাক হয়ে দেখল— পাখিটি কত কষ্ট করে তার বাসা তৈরি করছে! কয়েক দিন পর তন্বি দেখল, ওই বাসায় ছোট ছোট চারটি ডিম। তন্বির আনন্দ আর ধরে না! সে সারাদিন শুধু ওই পাখির বাসার দিকে তাকিয়ে থাকত।
তন্বির মা তাকে বোঝালেন যে, পাখির ডিম স্পর্শ করা উচিত নয়, এতে মা পাখি ভয় পেতে পারে। তন্বি মায়ের কথা মেনে নিল এবং দূর থেকেই পাখিটির যত্ন নিতে শুরু করল। সে বারান্দার এক কোণে পাখির জন্য চাল আর জল রেখে দিত। মা পাখিটি নির্ভয়ে সেই খাবার খেত। তন্বি ও মা পাখির মধ্যে এক অদ্ভুত সখ্যতা তৈরি হলো।
দিন কাটছিল, আর তন্বির কৌতূহল বাড়ছিল। একদিন সকালে তন্বি ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে দেখল, চারটি ডিম ফুটে ছোট ছোট ছানা বের হয়েছে। তাদের গায়ে তখনও পালক গজায়নি,কিচিরমিচির শব্দে তারা মুখর করে তুলেছে চারপাশ। মা পাখিটি পরম মমতায় বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। তন্বি দ্রুত দৌড়ে গিয়ে তার মাকে ডেকে আনল এই দৃশ্য দেখার জন্য। সে মহা খুশি! তার নতুন বন্ধু হয়েছে। তন্বি এখন আরও বেশি করে পাখির জন্য খাবার আর জল রেখে দেয়।
ধীরে ধীরে বাচ্চাদের পালক গজাল, তারা মিষ্টি করে ডাকতে শিখল। সবকিছু খুব ভালোই চলছিল। কিন্তু একদিন তন্বি দেখল, ছানাগুলো বড় হয়ে গেছে এবং তারা উড়তে শিখছে। হঠাৎ মা পাখিটি তার বাচ্চাদের নিয়ে নীল আকাশে ডানা মেলল। তন্বির মনটা মুহূর্তেই বিষণ্ণ হয়ে গেল। তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন:
"পাখিরা মুক্ত আকাশের জীব, তন্বি। তুমি তাদের খাঁচায় বন্দি করে রাখতে পারো না। তাদের প্রকৃত সৌন্দর্য ওই মুক্ত আকাশেই।"
তন্বি এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। তার শৈশবের স্মৃতির পাতায় এই ছোট্ট পাখিগুলোর গল্প আজও অমলিন হয়ে আছে। সে এখন বুঝতে পারে যে, ভালোবাসা মানেই কাউকে বেঁধে রাখা নয়, বরং তাকে তার মতো করে ডানা মেলতে সাহায্য করা।

.png)

Comments
Post a Comment