গল্প
ছোট্ট গল্প
বাইরে প্রচুর বৃষ্টি। ছাতাটা নিতেও ভুলে গেছে রনি। বাচ্চা ছেলে বলে কিছুই বলে না। বড়ো হলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে নিজেকে শান্তনা দেয় শফিক চৌধুরী। গাড়ির ড্রাইভার ও অসুস্থ ছুটিতে। হাজারো ব্যস্ততা রেখে গাড়িটা নিয়েই বেরিয়ে পড়ে স্কুলের উদ্দেশ্য। বৃষ্টির রিমজিম শব্দ যেনো আন্দোলিত করছিলো মনটা। রাস্তার পাশে লাল কৃষ্ণচূডার গাছ যেনো স্বাগত জানাচ্ছিলো তাকে। রনির মা মারা যাওয়ার পর নিজেকে হারিয়ে প্রচন্ড ব্যস্ত হয়ে করে ফেলেছিলেন তিনি। কতোদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। কিছুক্ষণ পরই রনির স্কুলে চলে এলেন। এই প্রথম তিনি স্কুলে এসেছেন, আশাহত হলেন। তিনি কখনো চান নি তাঁর সন্তান এরকম কোনো স্কুলে পড়ুক। কিন্তু নিজের স্ত্রীর সাথে পেড়ে উঠেন নি। জিজ্ঞেস করলেই বলতো তাঁর ছেলে যেনো সবার সাথে মিশতে পারে গরিব দুঃখী যেনো ভেদাভেদ না করে। কতোই না তর্ক হতো। অথচ ছয় মাস হলো সে নেই। হালকা ব্যথিত হয় এসব মনে করে। ছাতাটা নিয়েই স্কুলের ভিতর চলে যান। ছেলে দাড়িয়ে একটা ছেলের সাথে। ময়লা টি শার্ট,ব্যাগটাও পুরোনো,এক পা নেই, একহাতে স্কেচ। বোঝাই যাচ্ছে শহরের সব থেকে পুরনো প্রাইমারি স্কুল। রিনাকে যে কতোবার বলছি তাঁর একটাই কথা আমার মতো ছেলেকে পাষাণ বানাতে চায় না। কতো টাকা যে সে বিভিন্ন বস্তুিতে ফেলেছে। লাভ তো হয় নি।
শফিক : সরি বাবা দেরি হয়ে গেছে। আর হবে না।
রনি: ডোন্ট ওরি বাবা।
মুচকি হাসি দিয়ে সামনে হাটছি। গাড়িতে উঠতে যাবো দেখলাম রনি নিজে ভিজে যাচ্ছে অথচ তাঁর বন্ধুকে ভিজতে দিচ্ছে না। ছাতা তো একটা, রাস্তা পিচ্ছিল যেনো পড়ে না যায় তাই এক হাত ধরে রেখেছে ও। আমি স্তব্ধ হয়ে রইলাম।
রনি: বাবা, রাজুর বাসা সামনে তুমি একটু নামিয়ে দিতে পারবে। বৃষ্টিতে রাস্তা কাঁদা হয়ে গেছে ওর যেতে কষ্ট হবে।
শফিক : আচ্ছা বাবা, চলো
কিছু বলি নি। চুপচাপ উঠে গেলো। পাঁচ মিনিট পরই নামিয়ে দিলাম। বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসলো রাজুকে ছাতা নিয়ে।
রনিকে সামনের সিটে বসতে বলি। এখনও অনেক বৃষ্টি পড়ছে।
রনি: বাবা তুমি কি মন খারাপ করেছো আমার উপর?
শফিক : কেনো,, একথা কেনো বলছো।
রনি: এই যে রাজুকে লিফট দিতে বললাম।
শফিক : না বাবা, তুমি তো ভালো কাজ করেছো। কয়েকটা প্রশ্ন করবো রনি?
রনি: জি বাবা বলো
শফিক : তুৃৃমি ওকে সাহায্যর বিনিময়ে কি পেলে?
রনি: (চুপ)
শফিক: (বয়স অনুসারে ওকে এই প্রশ্নটা করা কি ঠিক হলো,)
রনি: শান্তি আর ভালোবাসা
শফিক : কিভাবে?
রনি: ও হাটতে পারে না। প্রায়দিনই আমি ওকে বাসায় দিয়ে যাই কারণ যাওয়ার সময় ওর বাসা সামনেই পড়ে। পর বাবা নেই। ও খুব গরিব আব্বু। প্রায় মন খারাপ করে থাকতো আমি ওর সম্পর্কে সব কিছু জানি। আমাকে পড়াশোনায় ও সাহায্য করে। টাকা নেই বলে স্কেচ কিনতে পারে নি। আমি আমার টিফিনের টাকা আর মাম্মি কিছু টাকা দিয়েছিলো একটা কিনে দিয়েছি। বাসায় রেখে যাওয়ার পর ও যে হাসিটা আমাকে উপহার দেয় আমি আর কোথাও এই শান্তি পাই না বাবা।
শফিক গাড়ি চালাচ্ছে। একটা বকুল গাছের নিচে থামালো।
রনি: বাবা, তুৃমি গাড়ি থামালে কেনো?
শফিক : বৃষ্টিতে ভিজবে?
রনি:(মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যতোটা না অবাক তার থেকে বেশি খুশি হয়েছে)
হ্যা হ্যা আব্বু অনেক দিন ভিজি না।
বেরিয়ে পড়লো। মনে হয় যেনো নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছি। বকুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে। মুগ্ধতা ছেয়ে যাচ্ছে। ছোট্ট ছেলেটা যেনো মা হারানোর কষ্টটা কিছুটা হলেও ভুলে গেছে।
শফিক ভাবছে, তুমি জিতে গেছো রিনা। আমার ছেলেকে দায়িত্ব শিখিয়েছো যেটা আমার দ্বারা সম্ভব ছিলো না। স্কুল দেখেই ভেবেছিলাম পরিবর্তন করবো। অথচ নাহ, আমি এই স্কুলটাকেই বাচ্চাদের উপযুক্ত করে তুলবো।
রনি হাত ধরে ডাকছে, আসো না বাবা বকুল ফুল কুড়াই। মা অনেক পছন্দ করতো। মালা বানাতো।
মনে হচ্ছিলো রিনার ভালোবাসাগুলো এখনো জীবন্ত।
তোমার প্রিয় কাজগুলোর মধ্যেই তুমি বেঁচে থাকবে আমাদের মাঝে। ভালোবাসি প্রিয়.......
-Tasfia

Comments
Post a Comment