মাধবীলতা ফুল

 


  মাধবী বা মাধবীলতার অনেক নাম- মণ্ডপ, কামী, পুষ্পেন্দ্র, অভীষ্টগন্ধক, অতিমুক্ত, বিমুক্ত, কামুক ও ভ্রমরোৎসব।সৌন্দর্যময়ী শ্বেতশুভ্র মাধবীলতা। এই ফুলটি আমাদের বাংলাদেশে প্রথম আবিষ্কৃত ফুল। বাংলাদেশ থেকেই এর নামকরণ করা হয়েছিল। তাই এ ফুলটির প্রতি ফুলপ্রেমীদের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। বাংলা সাহিত্যেও এ ফুলটি বিশেষ মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত


 

   মাধবীর বৈজ্ঞানিক নাম _Hiptage benghalensis_। এসব নাম মাধবীর ভাব প্রকাশে ব্যবহার হয় এবং কাব্যরসে ভরপুর। এক সময় পুণ্ড্রক দেশে অর্থাৎ ময়মনসিংহে মাধবীলতা প্রচুর পাওয়া যেত। এর জন্য এর আরেক নাম পুণ্ড্রক। মাধবীলতা দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, ভারত, ফিলিপাইন-এর উদ্ভিদ।



    মাধবী বৃক্ষারোহী লতা এবং দীর্ঘজীবী। ডাল ছোট ছোট এবং ঝোপঝাড় হয়ে যায়। এভাবে বহুবর্ষী হলে ধীরে ধীরে মূল লতাটি বেশ মোটা হয়ে যায়। ডাল দু' তিন বছর পরপর কেটে দিতে হয়, তারপর লতা যতই বাড়তে থাকে ততই নতুন নতুন ডালপালা গজায় ফুল বেশি ফোটে। এর মোটা মোটা ডালের ছাল মেটে রঙের, ভেতরের কাঠ লালচে ও শক্ত। পাতা বিপরীতমুখী, আয়তকার, বোঁটার দিক থেকে আগা ক্রমশ সরু, সাধারণত ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা হয়। অনেকটা চাঁপা ফুলের পাতার মতো। বাগানের শোভার জন্য যত্ন করে মাধবী লাগানো হয়। তবে এই লতা গাছটি এখন প্রায় দুষ্প্রাপ্য।



   মাধবীর ফুল গুচ্ছবদ্ধ ও বিন্যাস সুসংবদ্ধ। মুকুলগুলো সূক্ষ্ম রোমে ভরা। ফুল সাদা রঙের, পাঁচটি পাপড়ি এবং তার মধ্যে পঞ্চম পাপড়িটির গোড়ার দিক হলদেটে। ফুল দেখতে তিল ফুলের মতো এবং খুব সুগন্ধি। বসন্ত ও গ্রীষ্ম এই ফুলের ঋতু হলেও কখনো কখনো বর্ষা পর্যন্ত ফোটে। ফুল থেকে ফল হয়, বীজ থাকে ২/৩টি এবং তা রোমশ।




  মাধবী অযত্নেও বাড়ে, বীজ থেকে চারা হয়, ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে রাখলেও চারা পাওয়া যায়। বসন্তকালই এই মাধবী লতার প্রস্ফুটিত হওয়ার মৌসুম। এসময় প্রকাশিত ফুলেদের গায়ে প্রতিনিয়তই মৌমাছি, প্রজাপতিসহ নানান প্রকৃতিবন্ধুরা নিয়মিত ভ্রমণ করে।



  এর বৈজ্ঞানিক নামটি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, একটি অংশে ‘Benghalensis’ শব্দটি আছে। এ নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে এটি বাংলাদেশের ‘অরিজিন’ ফুল। মাধবীলতা বাংলার উদ্ভিদ এবং বাংলাদেশেই এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল। 



  ফুলের বর্ণনা করে ড. জসীম উদ্দিন বলেন, ফুলগুলো গুচ্ছাকারে সজ্জিত থাকে। একেকটা গুচ্ছে থাকে বিশ থেকে ত্রিশটা ফুল। প্রতিটা একক ফুলে বোটা আছে এবং তাতে ৫টি করে বৃতি সংযুক্ত। এ ফুলে রয়েছে পাঁচটা পাপড়ি। এর রয়েছে ৫টা পাপড়ি: চারটা ছোট পাপড়ি ও একটি বিশেষ ধরনের বড় পাপড়ি। ছোট পাপড়িগুলো দুধের মতো সাদা রঙের এবং ওই বড় পাপড়ির মাঝখানে হলুদ ছাপ থাকে।সাদা পাপড়িতে সৌন্দর্য ছড়িয়েছে মাধবী।



   প্রফেসর জসীম উদ্দিন আরো বলেন, এ ফুলের পুংকেশর ১০টা। আকৃতিতে এর মাঝে দৈর্ঘ্যে ৯টা পুংদণ্ড ছোট এবং একটি পুংদণ্ড লম্বা। ফলে মাধবীর ফুলের আকৃতিটা আমাদের অন্য ফুলগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন। এই ফুলটিকে দেখে হঠাৎ করে বর্ণনা করা কঠিন। মানুষ ‘মাধুরীলতা’ ফুলের সঙ্গে ‘মাধবীলতা’র ফুলকে এক মনে করে ভুল করে থাকেন। 

   মাধবীলতা ফুলটির ফলের গায়ে ৩টি পাখা থাকে: একটি ছোট ও দু’টি বড়। পাখাগুলো ফল বিস্তারে সাহায্য করে বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর এবং উদ্ভিদ গবেষক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।


  আদি নিবাস ভারত, বাংলাদেশে এক সময় মাধবীলতা দুষ্প্রাপ্য হলেও এখানে সেখানে কারো কারো বাড়িতে মাধবীলতা দেখা যেতো। এখন আর দেখা যায় না। মাধবীলতার আরেক নাম পুষ্পক। 

  তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের ছোট, বড়, বুড়ো, যুবতী মেয়েরাও পূজা অর্চনার জন্য ফুল ছিঁড়ে ঝুড়িতে নেয়। তবে বর্ষা ঋতুতেও এ ফুল ফোটতে দেখা যায়।আর দৃষ্টিনন্দন ফুল যখন সাঁঝের বেলায় ফোটে। তখন আরো দারুণ লাগে। 




  
  
  পুরোনো বাত ব্যথা সারাতে মাধবীলতার পাতার রস লাগালে উপকার পাওয়া যায়। মাধবীলতার পাতা ও ডালের রস করে খেলে হাঁপানির ও শ্বাসকষ্ট ভালো হয়।মাধবীলতার শুকনো ছালের গুঁড়ো খোস-পাঁচড়া ও বিষাক্ত ঘায়ের উপর লাগালে অব্যর্থভাবে উপকার পাওয়া যায়। এ গাছের ডালপালার রস খেলে আমাশয় ভালো হয়। 


Comments

Popular posts from this blog

তন্বি ও পাখি

ঝিঁঝিঁ পোকা (Cicada) Molting

প্রজাপতি ও পিপি