পলাশ ফুল
পলাশ মাঝারি আকারের পর্ণমোচী বৃক্ষ।
বৈজ্ঞানিক নাম _Butea monosperma_। বৃক্ষটি Fabaceae পরিবারের সদস্য। তবে পলাশ গাছ তার ফুলের জন্যই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।সংস্কৃততে এটি কিংশুক এবং মনিপুরী ভাষায় পাঙ গোঙ নামে পরিচিত।
পলাশ গাছ সর্বোচ্চ ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। শীতে গাছের পাতা ঝরে যায়। এর বাকল ধূসর। শাখা-প্রশাখা ও কাণ্ড আঁকাবাঁকা। নতুন পাতা রেশমের মতো সূক্ষ্ম। গাঢ় সবুজ পাতা ত্রিপত্রী, দেখতে অনেকটা মান্দার গাছের পাতার মতো হলেও আকারে বড়।বসন্তে এ গাছে ফুল ফোটে। টকটকে লাল ছাড়াও হলুদ ও লালচে কমলা রঙের পলাশ ফুলও দেখা যায়। পলাশ ফুল ছোট, ফুল ২ থেকে ৪ সে.মি. লম্বা হয়।
পলাশ ফুলের আরেক নাম ‘অরণ্যের অগ্নিশিখা’। a ফুলের রং হলুদ, লাল ও লালচে কমলা রঙ এই তিন রকম হয়। পলাশ গাছ তার ফুলের জন্যই সবচেয়ে বেশি পরিচিত লাভ করেছে। ফাল্গুনের হাত ধরেই ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির আজ বর্ণিল সাজে সেজেছে।
কুঁড়িগুলো দেখতে অনেকটা বাঘের নখের মতো। শাখা-প্রশাখাগুলো আঁকাবাঁকা। নতুন পাতা রেশমের মতো সূক্ষ্ম। শীত মৌসুমে গাছের সব পাতা ঝরে যায় এবং গ্রীষ্মের ছোয়ায় নতুন পাতা গজাতে শুরু করে। ফুল ফোটার সময় গাছ থাকে পাতাশূন্য। দূর থেকে দেখে মনে হয় গাছে আগুন লেগেছে। গাছের আগুনরাঙা পলাশের রূপ কার না ভালো লাগে! দূর থেকেও মানুষের নজর কাড়ে।
পলাশের ফল দেখতে অনেকটা শিমের মতো। বাংলাদেশে প্রায় সব জায়গাতে কমবেশি পলাশ গাছ দেখতে পাওয়া যায়।ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
বাংলার গ্রামে ও শহরে প্রায় সব জায়গায় কম-বেশি পলাশ ফুল দেখতে পাওয়া যায়। গ্রামে পলাশ গাছের নিচে শিশুরা ফুল দিয়ে খেলা করে থাকে। শিশুরা একে অপরের কানে ফুল দিয়ে দেয়। গ্রামবাংলার এই দৃশ্য চোখে পড়ার মতো।
গাছটি কাঠ, রজন, পশুখাদ্য, ওষুধ এবং রঞ্জক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কাঠ মলিন সাদা এবং নরম। পানির নিচে টেকসই হওয়ায় এটি ওয়েল কার্ব এবং ওয়াটার স্কুপের জন্য ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানে আগুনে ঘি ঢালার জন্য এর কাঠের চামচ এবং লাডল ব্যবহার করা হয় । এর থেকে ভালো কাঠকয়লা পাওয়া যায়। কৃষকরা সাধারণত মাঠের বাঁধে গাছ লাগায় এবং মাটির ক্ষয় কমাতে ব্যবহার করে। কচি কান্ডগুলি মহিষ দ্বারা চারণ হিসাবে চরানো হয়। পাতাগুলি একসময় খাবার পরিবেশনের জন্য ব্যবহৃত হত যেখানে আজ প্লাস্টিকের প্লেট ব্যবহার করা হবে।
বীজে স্থির তেল এবং ফুলের রসের গ্লুকোসাইড বুট্রিনকে বিষ বলে মনে করা হয়। এর সেবনে মাথা ঘোরা , মাথাব্যথা এবং হাইপোটেনশন হতে পারে ।
ভারতে, গাছটি ল্যাক বাগ ( Laccifer lacca ) এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হোস্ট হিসাবে কাজ করে, যা শেলাক তৈরি করে । এটি প্রতি হেক্টর প্রতি লক্ষ গাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাঠি উৎপাদন করে।
বাকল একটি লাল রঙের এক্সিউডেট তৈরি করে যা শুকিয়ে গেলে " বুটিয়া গাম " বা "বেঙ্গল কিনো" নামক পদার্থে পরিণত হয়। আঠাকে ড্রাগিস্টদের দ্বারা মূল্যবান বলে মনে করা হয় কারণ এটির ক্ষয়কারী গুণাবলী এবং চামড়ার শ্রমিকরা এর ট্যানিনের কারণে।
গাছের আঠা, যাকে হিন্দিতে কামারকাস বলা হয় , কিছু খাবারে ব্যবহৃত হয়।ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে এটি ফুলের চা থেকে গ্রীষ্মকালীন পানীয় হিসাবে প্রস্তুত করা হয় যা ঔষধি উপকারী বলে মনে করা হয়।
"কেশরী" নামে একটি ঐতিহ্যবাহী হোলির রঙ প্রস্তুত করতে ফুল ব্যবহার করা হয় । এটি কাপড়ের রঞ্জক হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। বুটেইন , ফুল থেকে তৈরি একটি স্পন্দনশীল হলুদ থেকে গভীর কমলা-লাল রঙের রঞ্জক, বেশিরভাগই সিল্কের জন্য এবং মাঝে মাঝে তুলা মারার জন্য ব্যবহৃত হয়।
পশ্চিমবঙ্গে , এটি বসন্তের সাথে জড়িত , বিশেষ করে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা এবং গানের মাধ্যমে , যিনি এর উজ্জ্বল কমলা শিখার মতো ফুলকে আগুনের সাথে তুলনা করেছিলেন । শান্তিনিকেতনে , যেখানে ঠাকুর এবং বিশালনারায়ণ বাস করতেন, এই ফুলটি বসন্ত উদযাপনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে । উদ্ভিদটি পলাশী শহরের নাম দিয়েছে , যেটি পলাশীর ঐতিহাসিক যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত ।
ঝাড়খণ্ড রাজ্যে , পলাশ লোক ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। অনেক লোকসাহিত্যিক অভিব্যক্তি পলাশকে বনের আগুন বলে বর্ণনা করে। ঝাড়খণ্ডের শুষ্ক পর্ণমোচী বনের সৌন্দর্য তাদের উচ্চতায় পৌঁছে যখন বেশিরভাগ গাছ তাদের পাতা ঝরিয়ে ফেলে এবং পলাশ ফুলে ফুলে ওঠে। পলাশও ঝাড়খণ্ডের রাজ্য ফুল ।
পলাশের নেশা তীব্র, পলাশ ফুল সবার মনে একবার হলেও দোলা দিয়েছে। তার ফুলের প্রেমের জালে জড়ায়নি হয়তো এমন কেউ খুজে পাওয়া দুস্কর। বসন্তে ফোটা পলাশ বনে ঘোর লাগে। তবে বড় ক্ষণস্থায়ী পলাশের মৌসুম। মাত্র ২০-২৫ দিন। তার নেশা লাগতে লাগতে, চিনে নিতে নিতে সে উধাও হয়ে যায়। যৌবনের উন্মাদনার মতো ক্ষণস্থায়ী। তবে এই ক্ষণস্থায়ী সুখ চলে গেলেও স্মৃতি থেকে যায় পুরো বছর। সেই স্মৃতি নিয়ে আমরা অপেক্ষায় থাকি অন্য বসন্তের...।
বসন্ত মানেই ফুলের সমারোহ আর ফুল মানেই রঙের মিলন মেলা। এইতো প্রকৃতি এখন পেয়েছে বসন্তের ছোঁয়া। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সবাই সাদরে বরণ করেছে ঋতুরাজ বসন্তকে। আর প্রকৃতিতে আগুন ঝরা পলাশ ফুল জানান দিচ্ছে বসন্ত চলছে। এই সময় পলাশ ফুলের সুন্দর্য দূর থেকেই আগুনের মতো জলতে দেখা যায়। ফুলের মেলায় পাখির কলতানে মুখরিত চারিদিক। বসন্ত এলেই সবার মনের মাঝে দোলা দেয় বসন্ত ফুল। এ যেন বসন্তে পলাশের রাজত্ব।
তিন প্রকার রঙের পলাশের মধ্যে হলুদ পলাশের জন্ম ভারতবর্ষে। গাছটি খুব কষ্ট সইতে পারে। রুক্ষ ও শুষ্ক মাটিতেও পলাশ বিনা যত্নে ফুল দেয়। গাছের বীজ দিয়ে নতুন চারা তৈরি করা যায়। তাই গাছটি থেকে বীজ সংগ্রহ করে দেশের সব উদ্যানে, পর্যটন কেন্দ্রে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ।



-61ffdeede388f.jpg)







Comments
Post a Comment