Nelumbo nucifera (পদ্ম ফুল)

   পদ্ম কন্দ জাতীয় ভূ-আশ্রয়ী বহু বর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। এর বংশ বিস্তার ঘটে কন্দের মাধ্যমে। পাতা জলের ওপরে ভাসলেও এর কন্দ বা মূল জলের নিচে মাটিতে থাকে। জলের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে গাছ বৃদ্ধি পেতে থাকে।পদ্মের বৈজ্ঞানিক নাম Nelumbo nucifera 




   পাতা বেশ বড়, পুরু, গোলাকার ও রং সবুজ। পাতার বোটা বেশ লম্বা, ভেতর অংশ অনেকটাই ফাঁপা থাকে। ফুলের ডাটার ভিতর অংশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য ছিদ্র থাকে। ফুল আকারে বড় এবং অসংখ্য নরম কোমল পাপড়ির সমন্বয়ে সৃষ্টি পদ্ম ফুলের। ফুল ঊধ্বর্মুখী, মাঝে পরাগ অবস্থিত। ফুটন্ত তাজা ফুলে মিষ্টি সুগন্ধ থাকে। ফুল ফোটে রাত্রি বেলা এবং ভোর সকাল থেকে রৌদ্রের প্রখরতা বৃদ্ধির পূর্ব পযর্ন্ত প্রস্ফুটিত থাকে। রৌদ্রের প্রখরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফুল সংকুচিত হয়ে যায় ও পরবর্তীতে রৌদ্রের প্রখরতা কমে গেলে আবার প্রস্ফুটিত হয়। ফুটন্ত ফুল এভাবে বেশ অনেক দিন ধরে সৌন্দর্য বিলিয়ে যায়।



   পদ্ম ফুলের রং মূলত লাল সাদা ও গোলাপীর মিশ্রণ যুক্ত। তাছাড়া নানা প্রজাতির পদ্ম ফুল দেখা যায়। এর মাঝে রয়েছে লাল, সাদা ও নীল রঙের ফুল।

   বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি প্রাকৃতিক জলাধার হাওর-বাঁওড়, খালে-বিলে ও ঝিলের জলে পদ্ম ফুল ফুটতে দেখা যায়। বর্ষা মৌসুমে ফুল ফোটা শুরু হয়। তবে শরতে অধিক পরিমাণে ফুল ফোটে এবং এর ব্যাপ্তি থাকে হেমন্তকাল অবধি। ফুটন্ত ফুলের বাহারি রূপ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। যে রূপের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে শরৎ ঋতুর পদ্ম ফুলকে নিয়ে অনেক কবি তার কাব্যের উপমায় পদ্ম ফুলের রঙ রূপকে তুলে ধরেছেন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে।




   সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষজনের কাছে অতি প্রিয় ও পবিত্র ফুল পদ্ম। বিশেষ করে দুর্গা পূজাতে পদ্ম ফুলের রয়েছে বেশ চাহিদা ও কদর। ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে পদ্ম ফুল সংগ্রহ ও বিক্রয় অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। 

  শালুক (waterlily) দেখতে পদ্মফুলের মতো হলেও শালুক পরিবারের (Nympheaceae) সঙ্গে পদ্ম পরিবারের (Nelumbonaceae) খুব একটা নিকটত্ব নেই। এদের পাতা দেখলে সহজেই পৃথক করা যায়। ভারতের জাতীয় ফুল বলে মনে করা হতো, সাংবিধানিক ভাবে তা নয়।পদ্ম ফুল বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র এবং আইকনিক উদ্ভিদের মধ্যে একটি। স্ট্রাইকিং ফুলটি ইতিহাস জুড়ে সবচেয়ে সমৃদ্ধ কিছু সংস্কৃতি এবং ধর্মের প্রতীকী প্রধান। 

   বদ্ধ এ জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে পদ্ম ফুল। পদ্ম ও শাপলা সারা বছর পাওয়া যায় ৩২৬ একর জলাভূমিতে। দুর্গাপূজায় ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও ঢাকায় যায় এ বিলের পদ্ম ফুল। প্রতিটি পূজায় ১০৮টি পদ্ম ফুলের অত্যাবশ্যকীয়তায় পূজায় চাহিদা বেড়ে যায় পদ্ম ফুলের।

 


  পদ্ম ফুল, তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত, ইতিহাসের গভীর শিকড় রয়েছে। গবেষকরা অনুমান করেন যে প্রথম পদ্ম ফুল 145.5 মিলিয়ন বছর থেকে 65.5 মিলিয়ন বছর আগে জন্মেছিল। 

  এখন আন্তর্জাতিকভাবে সঞ্চালিত, লোটাস ড্যান্স মূলত 1600-এর দশকে রাজাদের ভিয়েতনামী প্রাসাদে তৈরি হয়েছিল। নৃত্যটি একটি বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং এটি বুদ্ধের জন্ম উদযাপনে পদ্ম ফুলের খোলার অনুকরণ করে। 

  পদ্মের বীজ একাধিক সন্তানের জন্য আশার প্রতীক, এবং লাল মটরশুটি শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। থালা খাওয়া একটি উর্বর ভবিষ্যতের জন্য নবদম্পতি সৌভাগ্য এবং আশীর্বাদ নিয়ে আসে বলে মনে করা হয়। 



  বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষার শেষে এবং শরতের শুরুতে বিল-ঝিল, পুকুরে সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্ত থেকে ফুটতে শুরু করে মনোমুগ্ধকর জলজ ফুলের রানি ‘পদ্ম’! সারারাত ধরেই একে একে পাল্লা দিয়ে সৌরভ ছড়িয়ে ফুটতে থাকে পদ্মফুল। তাই এক বিল বা পুকুর পদ্ম যেন গভীর সৌন্দর্যের আধার। তবে কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশে পদ্ম বিল ও পুকুর অনেক কমে এসেছে। 

  পদ্মের বীজ বেশ সুস্বাদু, ফ্যাট, মিনারেল ও ট্রেস উপাদানযুক্ত। যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এ বীজ দ্রুত ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে। তাই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এ বীজ খেয়ে কয়েকদিন না খেয়ে থাকত গেরিলা এবং সাধারণ মানুষ। পদ্ম মধু থেকে চোখের ঔষধ তৈরী হয় ।শ্বেতী রোগ ভাল করে।হৃদশূলের যন্ত্রণা কমায়।সিপাহী বিদ্রোহের সময় পদ্ম উপহার সাংকেতিক ভাষা হিসাবে ব্যবহার হত। তাছাড়া পদ্ম ফুল ভেষজগুণ সমৃদ্ধ ফুল গাছ। এর ডাটা সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। মানব দেহে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণে অতুলনীয়। চুলকানি ও রক্ত আমাশয় নিরাময়ে বেশ উপকারী । 




  অনেক গ্রামে গেলে দেখা যায়, জ্বর হলে বাচ্চাদের পদ্মপাতায় শুইয়ে রাখতে।অর্শ্ব বা গেজ রোগে পদ্মপাতা ও মূল ব্যবহৃত হয়।. প্রসবের পর মায়েদের নাড়ি সরে এলে (প্রোলাপ্স অব ইউটেরাস) সারাতে ভূমিকা রাখে।শুষ্ক কাশি নিরাময়ে বাসক পাতা ও মধুর সাথে পদ্মের মূল ও কেশর ভালো কার্যকারিতা দেয়। নারীদের অনিয়মিত ঋতুস্রাবে পদ্মের মূল ও বীজ বেশ কাজের।পদ্মবীজ দেহের ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনে সহায়তা করে।পদ্মবীজের প্রোটিন ও কার্বহাইড্রেট ডায়াবেটিস আক্রান্তদের জন্য উপকারী। পদ্মবীজ দেহের ওজন কমাতে সহায়তা করে। এর বীজ গ্যাস্ট্রাইটিস ও রক্তপাতজনিত সমস্যা দূর করতে সহায়ক। । ত্বক সুন্দর করতে পদ্মপাতা, ফুলের পাপড়ি ও বীজের নানা ভূমিকা আছে।  ‘সুগন্ধি’ বা ‘অ্যারোমা’ হিসেবে প্রসাধনী শিল্পে পদ্ম ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 




  একসময় গ্রামবাংলার হাট-বাজারে গুঁড়া মসলা, গুড়, চিনি, লবণ, অন্য জিনিসপত্র এবং বিভিন্ন মেলায় বাতাসা, মোয়া, মুড়ি, মুড়কি, নাড়ু, লাড্ডু ইত্যাদি পদ্মপাতায় সুন্দরভাবে বেঁধে বিক্রি করা হতো। সহজলভ্য ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এর ব্যবহার ছিল অসাধারণ। এখনো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী পদ্মপাতায় খাবার পরিবেশন করা হয়। দৈনন্দিন নানা কাজে এর পাতা ও ফুল ব্যবহার করা হয়। 

 

  পবিত্র পদ্মের স্টার্চি রুটস্টক ( রাইজোম ) চীন , জাপান, ভারত এবং অন্যান্য এশিয়ান দেশগুলিতে ব্যাপকভাবে খাওয়া হয়। এগুলি তাজা এবং প্রায়শই সম্পূর্ণ বিক্রি হয় এবং হিমায়িত বা টিনজাত পাওয়া যায়। তারা কমল খাবার নামে পরিচিত স্টার্চের উৎস। রাইজোমগুলি স্যুপ এবং তরকারিতে সাধারণ এবং এটি ভাজা বা মাংস দিয়ে স্টাফ করা হয়, অথবা সেগুলি সিদ্ধ বা চিনিতে সংরক্ষণ করা যেতে পারে । 



   

  শুকনো ফলের মাথা, প্রায়ই "শুঁটি" নামে পরিচিত, ফলগুলিকে রাখা অসংখ্য খালি গর্ত দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। লোটাস পডসার শুকনো বিন্যাসে ফুল বিক্রেতারা ব্যবহার করেন।  

  আসলে পুরো পবিত্র পদ্ম গাছটি ভোজ্য। সিদ্ধ কচি পাতা সবজি হিসাবে খাওয়া হয় এবং ভাত এবং বাষ্পযুক্ত খাবারের মোড়ক হিসাবে সাধারণ । এমনকি পদ্মের পুংকেশর ব্যবহার করা হয় চায়ের স্বাদের জন্য , এবং শুকনো পাপড়িও চা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। তাজা, শুকনো বা হিমায়িত-শুকনো পদ্মের বীজ পুষ্টিকর এবং পদ্ম বীজ নুডলস সহ বিভিন্ন খাবারে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পদ্মের বীজ হল চীনা মুনকেকের একটি ঐতিহ্যবাহী উপাদান , যা মধ্য- শরৎ উৎসব উদযাপন করতে ব্যবহৃত হয়। বীজগুলিকে দীর্ঘায়ুর অসাধারণ ক্ষমতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ঐতিহ্যগত প্রাচ্য চিকিৎসায় বিভিন্ন রোগের জন্য ব্যবহৃত হয়। 



Comments

Popular posts from this blog

তন্বি ও পাখি

ঝিঁঝিঁ পোকা (Cicada) Molting

প্রজাপতি ও পিপি